বিদ্যালয়ের ইতিহাস
১৯১৪ সাল বিশ্বব্যাপী প্রথম মহাযুদ্ধের দামামা বাজছে। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে উম্মাদ পৃথিবী। ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষর মঞ্জুরিত পত্রাবলীতে এক পোচ রক্তাক্ত স্বাক্ষরের যে কি প্রবল আগ্রহ মন্ডিত উদ্বোধন। ১৯১৪ সালের যুদ্ধ ডাকের সুরে বাঁকা পথ বেয়ে জানিনা বিধাতার কোন অলৌকিক দানের পশরা বয়ে নেমে এলো বিদ্যা দেবীর বীণা আহবান। আর তা শুনলেন হাটবাড়িয়া জমিদার জিতেন রায়ের নায়েব ভুবন মোহন বন্দোপাধ্যায়। ভুবন বাবু স্থানীয় কালীনগর কাচারীর নায়েব বাবু জমিদারী নিপিড়নের যুগে এদের দোর্দন্ত প্রতাপ। অবশ্য ভুবন বাবু তাঁদের ব্যতিক্রম। যা হোক তিনি প্রগতির উচ্ছ্বাসে শুনলেন যে বিদ্যার গান তা শুনালেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তাঁরা হচ্ছেন যোগেন্দ্র চক্রবর্তী, যজ্ঞেস্বর সিংহ, রাম চন্দ্র সর্বজ্ঞ, সব্দু মিয়া, জনাব আবুয়াল কাশেম মিঞা প্রমুখ। সবাই শুনলেন বুঝলেন বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ঝামেলা। স্বতস্ফুর্ত গ্রাম বাসীর সহযোগিতায় সব ঝামেলা এড়িয়ে স্কুল হল ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। ছাত্র সংখ্যা ১০ জন মাত্র। ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাশ খোলা হল। স্কুলের জন্য জায়গা দান করলেন রাজকুমার পোদ্দার। চাঁদা তোলা হলো পার্শবর্তী গ্রামগুলিতে। কাঠ যোগালেন রাম চন্দ্র সর্বজ্ঞ। সেদিন ৪২ শতাংশ জমির উপর টিনের চালা ঘর তৈরী করলেন প্রধান শিক্ষক ননী ভূষণ সরকার, স্কুলের সম্পাদক রূপাপাতের বিশিষ্ট মুসলমান নেতা ও জ্ঞান দেবীর বরপুত্র সব্দু মিঞা।
স্কুল এগিয়ে চলে। ৪ বছর পর ১৯১৮ সালে স্কুলের Appellation এর প্রয়োজন অনুভব করেন উদ্যোক্তারা। বলা বাহুল্য ঐ বৎসর প্রথম দশম শ্রেণি খোলা হয়। মোট ছাত্র ছিল প্রায় ৩০০ জন। কিন্তু Appellation পেতে হলে ১৫০০/- টাকা Deposite দেখাতে হবে। কে আছেন এমন দরদী এক সময়ে ১৫০০/- টাকা দিয়ে সাহায্য করবেন স্কুলকে। ঐ সময় ১৫০০/- টাকার মূল্য আজকে অনেক বেশী। এগিয়ে এলেন রূপাপাতের শিক্ষানুরাগী বামন চন্দ্র দত্ত। প্রতিষ্ঠিত হলো স্কুল নাম হলো “রূপাপাত বামন চন্দ্র ইনষ্টিটিউশান”। বামন বাবু নিঃসন্তান কিন্তু দেশের শ্রেষ্ঠ ধনী। লোকমুখে প্রচার ছিল লোকটি যেমন টাকার কুমীর তেমনি কঞ্জুস। অথচ শুনেছি ১৯১৮ সালে Appellation পাওয়ার কয়েকদিন পরেই স্কুল Inspection এ আসেন Inspector কালীপদ বসু। স্কুলের অফিস ঘরে বসা হেড মাষ্টার অশোক বোস আর Inspector কালী বাবু। হঠাৎ ঘরে ঢোকেন আদুল গায়ে গামছা কাঁধে আর হাঁটুর পরে তোলা এক টুকরো কটকে ধুতি পড়া একজন গ্রামবাসী। ঢুকেই তিনি বলেন স্পেক্টর বাবু আমার স্কুলটা দেইখো। কে আপনি ? স্বতস্ফুর্ত বিস্ময় কালী বাবুর কন্ঠে। আমি, এই স্কুল, স্কুলই আমি। বলেন গ্রাম্য লোকটি। আপনার নাম ? বামন চন্দ্র দত্ত বনিক। হেড মাস্টার বুঝিয়ে দেন ইনিই স্কুলের Appellation এর ১৫০০/- টাকা দান করেন। এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যায় কালী বাবুর কাছে। তিনি বলেন- বসুন দত্ত বাবু। তা স্কুলের জন্য কিছু দান না করলে যে হয় না। কত টাকা দিতে হবে কও। জিজ্ঞাসা কত্তা বাবুর চোখে মুখে। তা বেশ। বেরিয়ে আসেন দত্ত। ঘরে ঢোকেন পাঁচ মিনিট পর। হাতে দু পেটি কাঁচা টাকা। তোড়া দুটি টেবিলের উপর রেখে বললেন এই নাও স্পেক্টর বাবু- ঠিক আছে আপনার কাছেই থাক যখন লাগবে তখন চেয়ে নেব। বিস্মিত ইনস্পেক্টর কালী পদ বসু। তার পর থেকে বামন বাবুর দানে আর স্থানীয় জনসাধারণের আন্তরিকতায় এগিয়ে চলছে স্কুল।
১৯৫৩ সালে সরকার থেকে ২৬০০০/- টাকার এক Grant এসে হাজির আর সেই টাকায় ঐ বছরে তৈরী হল পুরাতন লাইব্রেরী বিল্ডিং, কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব। এরই মধ্যে বাদশা খোন্দকারের প্রচেষ্টায় স্কুল প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদ। খেলার মাঠ থাকা সত্বেও স্কুলের দাবী ছিল না, তার পর ১৯৬১ সালে মাঠ দান করেন সুরেন্দ্র মন্ডল, যোগেন্দ্র মন্ডল, কালী চরণ বিশ্বাস ও শ্যামাচরণ বিশ্বাস।
১৯৫৫ সালে রূপাপাত বামন চন্দ্র ইনষ্টিটিউশান হতে সপ্তম শ্রেণি পাস করে ঢাকায় নবকুমার ইনষ্টিটিউশানে ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হন বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান। লেখা পড়া শেষ করে ১৯৬৪ সালের নভেম্বর মাসে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। চাচা মোঃ ফজলুল করিম মিঞা স্কুলের সদস্য থাকা অবস্থায় ১৯৬৬ সালের ৬ মে ইন্তেকাল করেন। তখন স্কুলের সেক্রেটারী জনাব আব্দুল মান্নান মিঞা এবং বাবু হরিশ চন্দ্র রায়ের অনুরোধে চাচার শূন্য পদে প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান স্কুলের মেম্বার হতে রাজি হন। ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে বিদ্যালয়ের তৎকালীন সেক্রেটারি জনাব আব্দুল মান্নান মিঞা ইন্তেকাল করলে বাবু হরিশ চন্দ্র রায় এবং প্রধান শিক্ষক বাবু অমূল্য চন্দ্র সর্বজ্ঞ মহাশয়ের অনুরোধে প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান সেক্রেটারী হন। ১৯৬৪/৬৫ সাল। ঐ বছর স্কুল Development Scheme এ যায়। Science Building করার জন্য ৫৬০০০/- টাকার বিল পাস হয় স্কুলের নামে। দালান তৈরীর কন্ট্রাক নেন পুলিন বিহারী সরকার ও মনীন্দ্রনাথ পোদ্দার। স্কুলের সীমানা বর্ধিত করে প্রাইমারীর দালান স্থানান্তর, মসজিদ সংস্করন, স্কুল প্রাঙ্গণে মাটির কাজ এ বছরকে এক অনবদ্য কর্মকোলাহলে মুখর করে তোলে। এই আনন্দ কাকলীর মধ্যে একদিন দেখা গেল নব নির্মিত বিজ্ঞান ভবনের ছাদ চুইয়ে জল পড়ে। অথচ কন্টাক্টর বাবুকে পাওয়া গেল না। জনতার কাছে কৈফিয়ত দিতে হলো তৎকালীন প্রধান শিক্ষক শ্রী অমূল্য চন্দ্র সর্বজ্ঞ সহ চারজনের। প্রধান শিক্ষক ছাড়া বাকী তিনজন মনিন্দ্রনাথ পোদ্দার, ক্ষীরোদ চন্দ্র দত্ত এবং রোকন উদ্দিন মিয়া, জরিমানা দিতে হলো ৮০০০/- টাকা, নতুন করে গড়ে দিতে হলো বিজ্ঞান ভবনের ছাদ।
বিজ্ঞান ভবন তৈরীই শুধু নয়, এ বছরে ১২০০০/- টাকার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কেনা হয় সেই সঙ্গে কেনা হয় স্কুলের জন্য একটি টাইপ যন্ত্র, একটি রেডিও সেট, মাইক। এ বছর পৃথকভাবে মেয়েদের ও শিক্ষকদের কমন রুমের ব্যবস্থা করা হয়। তৈরী করা হয় ছয়টি পায়খানা, দুটি প্রস্রাব খানা। অনেক বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে স্কুলে নয় সিট বিশিষ্ট ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয় স্কুলের ছাত্ররা। ১৯৬৮ সালে স্কুলের পাশের হার শতকরা একশ।
এক সময় স্কুলের সেক্রেটারী থাকতেন জনসাধারণের মধ্য থেকে গন্যমান্য ব্যক্তি এবং সভাপতি থাকতেন মহাকুমা প্রশাসক। পরবর্তীকালে সেক্রেটারী পদাধিকারবলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং সভাপতি জনসাধারণের বা সদস্যদের মধ্য থেকে কাউকে মনোনীত বা নির্ধারিত হওয়ার বিধি বলবৎ হয়। ১৯১৪ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যতটা তথ্য পাওয়া যায় তাতে জানা যায় স্কুলের প্রথম সেক্রেটারী ছিলেন রূপাপাত গ্রামের জনাব ছব্দু মিঞা।
ধারাবাহিকভাবে যাঁরা সেক্রেটারী ছিলেন-
১. জনাব মোঃ ছব্দু মিঞা (রূপাপাত)
২. বাবু হরিশ চন্দ্র রায় (উজিরপুর-তিনি দীর্ঘ বাইশ বছর সেক্রেটারী ছিলেন)
৩. জনাব রোকন উদ্দিন মিয়া (কদমী-নসুমিয়া)
৪. জনাব আব্দুল মান্নান মিয়া (দোলাগ্রাম)
৫. প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান (যদুনন্দী)
৬. বাবু মনোরঞ্জন সাহা (রূপাপাত)
৭. বাবু অমূল্য চন্দ্র সর্বজ্ঞ (প্রধান শিক্ষক, পদাধিকারবলে)
৮. জনাব সৈয়দ আবু বক্কর (প্রধান শিক্ষক, পদাধিকার বলে)
৯. জনাব মোঃ ফজলুল হক, চান মিয়া (প্রধান শিক্ষ, পদাধিকারবলে)
১০. জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান (প্রধান শিক্ষক, পদাধিকারবলে)
১১. জনাব মোঃ মতিয়ার রহমান (প্রধান শিক্ষক,পদাধিকারবলে)
১২. জনাব পরিমল চন্দ্র দাস (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক,পদাধিকারবলে)
১৩. জনাব সুশীল কুমার বিশ^াস (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক,পদাধিকারবলে)
১৪. জনাব মোঃ শাহ্জাহান শেখ (প্রধান শিক্ষক, পদাধিকারবলে)
স্কুলের সভাপতির পদ এক সময় মহাকুমা প্রশাসক থেকে ইউএনও হয়। সদস্যদের থেকে একজন সহসভাপতি নির্বাচিত হয়। রূপাপাত বামন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি ছিলেন পর্যায়ক্রমে-
১. জনাব আব্দুল মান্নান মিয়া (কদমী)
২. জনাব সৈয়দ মোশাররফ হোসেন (যদুনন্দী)
৩. জনাব মোঃ হাবিবুর রহমান মোল্যা (রূপাপাত)
৪. জনাব বিমল পোদ্দার (রূপাপাত)
৫. জনাব এফ,এম মোশাররফ হোসেন (রূপাপাত)
৬. জনাব মোঃ হেমায়েত হোসেন (
৭. জনাব আবুল খায়ের ফকির (কালিনগর)
সদস্য বা গণ্যমান্য ব্যক্তি/শিক্ষানুরাগীদের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধি জারি হয়। ১৯৮৭ সালে এই বিধি প্রবর্তন হওয়ার পর প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান সভাপতি মনোনীত হন এবং ২০০৯ সালের মে মাস পর্যন্ত নির্বাচিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পর্যায়ক্রমে যারা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন-
১. প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান (১৯৮৭ - ২০০৯)
২. জনাব মোঃ আক্তার হোসেন মিঞা (২০০৯ - ২০১১)
৩. প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান (২০১১ - ২০১৩)
৪. জনাব মোঃ লুৎফার রহমান খালাসী (২০১৩ - ২০১৫)
৫. প্রফেসর মিঞা লুৎফার রহমান (২০১৫ - ২০১৭)
৬. জনাব মোঃ মিজানুর রহমান মোল্লা (২০১৭ - ২০১৯)
৭. জনাব মোঃ নিরুল মিঞা (২০১৯ - ২০২১)
৮. উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বোয়ালমারী, ফরিদপুর (০৩/০৮/২০২১ - ০৫/০১/২০২২)
৯. জনাব কামরুজ্জামান কাইয়ুম মোল্যা (২৯/০১/২০২২ - ২৮/০৫/২৩)
১০. জনাব মোঃ আক্তার হোসেন মিঞা (২৯/০৫/২০২৩ - ২৪/১১/২০২৩)
১১. জনাব মোঃ আক্তার হোসেন মিঞা (১৫/১২/২০২৩ - ১৩/০৬/২০২৪)
১২. উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বোয়ালমারী, ফরিদপুর (১৪/০৬/২০২৪ - - - - )
স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা হয়েছে। সকলের সহযোগিতায় রূপাপাত বামন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে শতবর্ষের পর দু,শত বর্ষের দিকে উঁচু শিরে এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
